রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
জাতীয়

ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার: এক বছর ধরে কারাবন্দি আলমাসকে মুক্তির নির্দেশ হাই কোর্টের

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 08 নভেম্বর 2026, 12:27 দুপুর • 4 বার পঠিত
ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার: এক বছর ধরে কারাবন্দি আলমাসকে মুক্তির নির্দেশ হাই কোর্টের

দুই যুগ আগের এক অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত মো. আলমাছের পরিবর্তে মো. আলমাসের নামের এক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হওয়ার এক বছর বাদে কারামুক্ত হতে যাচ্ছেন।

তাকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে রোববার আদেশ দিয়েছে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঁইয়ার হাই কোর্ট বেঞ্চ।

নামের মিলের কারণে দণ্ডিত ব্যক্তির পরিবর্তে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দাবি করে হাই কোর্টে রিট মামলা করেছিলেন কারাগারে থাকা আলমাস।

এ মামলার প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর হাই কোর্ট চার সপ্তাহের রুল জারি করে। প্রকৃত আসামির বদলে আলমাসকে গ্রেপ্তার ও আটক কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং কেন তাকে পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয় রুলে।

এর পাশাপাশি দুই ব্যক্তির পরিচয় অনুসন্ধান করে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেওয়া হয়। দোহারের ইউএনও ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপারকে অনুসন্ধানে সহযোগিতা করতে বলা হয়।

আদালতের নির্দেশে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে অনুসন্ধান করেন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমান।

গত ১ নভেম্বর দেওয়া অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০২ সালের অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত মো. আলমাছ এবং গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাস সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি। গ্রেপ্তার হওয়া আলমাস ওই মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন।

প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছ বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন বলে তার আত্মীয়দের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. তানভীর আহমেদ ও আবদুল্লাহ আবু সাঈদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শিহাব উদ্দিন খান ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মহিউদ্দীন মো. হানিফ।

মহিউদ্দীন মো. হানিফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এটি আপাতদৃষ্টিতে পরিচয় বিভ্রাটের ঘটনা বলে উঠে এসেছে। নাম ও বাবার নামের প্রায় মিলের কারণে এ বিভ্রান্তি হয়েছে। তবে মা ও দাদার নামসহ অন্যান্য পরিচয়ের ক্ষেত্রে দুজনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

তিনি বলেন, আরও সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত করলে শুরুতেই এই পার্থক্য শনাক্ত করা সম্ভব হতো।

ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ৩ কারণ

অনুসন্ধান প্রতিবেদনে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পেছনে তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো দুই ব্যক্তির গ্রামের নামের সাদৃশ্য, বাবার নামের মিল এবং ২০০২ সালের মামলার নথিতে লেখা ঠিকানার ভুল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের আদি গ্রাম ঢাকার দোহার উপজেলার নয়াবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব ধোয়াইর। অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া আলমাসের পরিবারের আদি গ্রাম একই উপজেলার দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন বাহ্রা। ২০০৭ সালের আগে তারা সেখানে বসবাস করতেন। নদীভাঙনের কারণে ওই বছর তাদের পরিবার সুন্দরীপাড়ায় চলে যায়।

দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীনে পূর্ব ধোয়াইরসহ একাধিক গ্রাম রয়েছে। ডাকঘরের নাম ব্যবহার করে ঠিকানা দেওয়ার প্রচলনের কারণে দুই ব্যক্তির ঠিকানায় বিভ্রান্তি তৈরি হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এতে বলা হয়, ২০০২ সালের অস্ত্র মামলার এজাহার ও এফআইআরে আসামি আলমাছের ঠিকানা ছিল পূর্ব ধোয়াইর। তবে তাকে আদালতে পাঠানোর ফরওয়ার্ডিংয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই এস এম মোস্তাক হোসেন ঠিকানা লেখেন ‘দক্ষিণ বাররা’। রায়-পরবর্তী ২০০৪ সালের ৬ অক্টোবরের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাতেও একই ভুল ঠিকানা বহাল থাকে। প্রতিবেদনে এটিকে তদন্ত কর্মকর্তার ‘অসতর্কতা’ এবং ‘বিভ্রান্তির বীজ’ বলা হয়েছে।

তবে ২০০২ সালের ১৪ অগাস্টের ওকালতনামা এবং ২০০৩ সালের ২০ এপ্রিল হাই কোর্টের জামিন আদেশে আসামির ঠিকানা পূর্ব ধোয়াইর বলা রয়েছে। এসব নথির সঙ্গে পরবর্তী সময়ে লেখা ঠিকানার পার্থক্য অনুসন্ধান প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের বাবার নাম বিভিন্ন নথিতে মো. খলিলুর রহমান, খলিল আহমেদ ও আবুল খায়ের (খলিল) পাওয়া গেছে। অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া আলমাসের বাবার নাম শেখ খলিল। বাবার নামের এই সাদৃশ্যও পরিচয় শনাক্তে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

গ্রেপ্তারের দিনই পরিচয় নিয়ে আপত্তি

অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর বিকাল ৩টার দিকে দোহার উপজেলার চর মোহাম্মদপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জুবাইদুল হক সুন্দরীপাড়া গ্রাম থেকে আলমাসকে গ্রেপ্তার করেন।

গ্রেপ্তারের সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পুলিশকে জানান, আলমাস প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকৃত আসামির পরিবারের সঙ্গে আলমাসের পরিবারের পরিচয়ের পার্থক্য রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তারকারী পুলিশ কর্মকর্তা আলমাসের জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে দোহার থানার ওসি মো. হাসান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠান। তারা ছবি ও পরিচয়পত্র যাচাই-বাছাই করার পরও তাকে আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

গ্রেপ্তারকারী এসআই জুবাইদুল হক তদন্তকারী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, পরিচয়ের বিষয়টি তিনি ওসি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন। এরপর ফাঁড়ির জিডি নম্বর ৮৪-তে ঘটনা নথিভুক্ত করে ৪ নভেম্বর আলমাসকে দোহার থানা হেফাজতে রাখা হয়। পরদিন ৫ নভেম্বর তাকে আদালতে পাঠানো হলে কারাগারে পাঠানো হয়।

অনুসন্ধান প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গ্রেপ্তারের দিনই মাঠপর্যায়ে পরিচয় বিভ্রাটের আভাস স্পষ্ট হয়েছিল। কিন্তু নির্দেশের দোহাই দিয়ে তা উপেক্ষা করা হয়। দুই জনপ্রতিনিধির জবানবন্দিতেও পুলিশ উপরের নির্দেশের কথা বলেছিল।

আলমাস তার জবানবন্দিতে বলেন, জবানবন্দির সময়ের প্রায় নয় বছর আগেও একই মামলায় তাকে ধরতে পুলিশ বাড়িতে এসেছিল। তখন এলাকার চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা বলেন, মামলার আসামি তিনি নন। এরপর পুলিশ ফিরে যায়।

দুই ব্যক্তির পরিচয়ে যেসব পার্থক্য

অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা দুই ব্যক্তির পরিচয় যাচাইয়ে সাতজনের জবানবন্দি নেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন দুই এলাকার জনপ্রতিনিধি, আলমাসের বাবা, স্ত্রী, প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের দুই আত্মীয় এবং গ্রেপ্তারকারী পুলিশ কর্মকর্তা। এ ছাড়া আলমাসের নিজের বক্তব্য এবং ডাকঘরের পোস্টমাস্টারের লিখিত প্রত্যয়নও পর্যালোচনা করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের দাদার নাম শেখ শহর আলী। নাগরিক সনদ, তার বাবার ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের লাইসেন্স এবং চাচাতো ভাই আনোয়ার হোসেনের জবানবন্দির সঙ্গে মিলিয়ে এ পরিচয় পাওয়া যায়। অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া আলমাসের দাদার নাম শেখ নওয়াব আলী।

প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের মায়ের নাম সালমা আক্তার বলে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন তার দুই আত্মীয়। অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া আলমাসের মায়ের নাম জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টে রওশনারা বা রাসনারা বেগম লেখা রয়েছে।

প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছ তিন বোনের একমাত্র ভাই। তার বোনদের নাম রেখা, লিপি ও শিল্পি। অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া আলমাসের দুই ভাই সেলিম ও আলামিন এবং দুই বোন আসমা ও নাজমা।

প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের চাচাতো ভাই আনোয়ার হোসেন ও আত্মীয় কাউসার মাহমুদ তাদের পারিবারিক পরিচয়, ভাইবোনের নাম ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আলমাছ বর্তমানে কানাডায় তার বোন রেখার সঙ্গে থাকেন।

২০০২ সালের অস্ত্র মামলা

রিট আবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল বিকাল ৩টার দিকে মিরপুরের হাজী রোড থেকে এসআই ইকবাল হায়াত আসামি মো. আলমাছ ও নাজমুল আলম মামুনকে গ্রেপ্তার করেন।

এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, আলমাছের ডান কোমরে গোঁজা অবস্থায় একটি ৩২ বোরের রিভলবার পাওয়া যায়। এ ঘটনায় মিরপুর থানায় অস্ত্র আইনে মামলা হয়।

২০০৩ সালের ২০ এপ্রিল হাই কোর্ট আলমাছকে জামিন দেন। পরে বিচার চলাকালে তিনি পলাতক হন। ২০০৪ সালের ১৯ জুন ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১১ রায়ে আলমাছকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০২ সালে আলমাছকে গ্রেপ্তারকারী এসআই ইকবাল হায়াত এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই এস এম মোস্তাক হোসেনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের কোনো ছবি বা হস্তাক্ষর কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাওয়া যায়নি।

পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের রুল

আলমাসের রিট আবেদনে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও কারাগারে রাখার ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত, তাকে আদালতে হাজির করা, তাৎক্ষণিক মুক্তি এবং পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে।

তবে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা বা অন্য কারও বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ কিংবা নির্দিষ্ট কারও দায় নির্ধারণ করা হয়নি। পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের আবেদনসহ রিট মামলার রুল এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।